1. admin@sylhetplus.com : admin :
শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন

দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা, শিক্ষা স্বাস্থ্যেও পিছিয়ে চা শ্রমিকরা

সিলেট প্লাস ডেস্ক
  • প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০২৪
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সুপেয় পানিসহ মৌলিক সব সূচকে পিছিয়ে রয়েছেন চা শ্রমিকরা

মূল্যস্ফীতির এই সময়ে দৈনিক ১৭০ টাকা মজুরিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন চা শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, অধিকাংশ চা বাগান শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার যথাযথ পূরণ করে না। এছাড়া শ্রম আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তগুলো সঠিকভাবে মানা হয় না।

চা শ্রমিকরা জানান, চা শিল্পের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বংশপরম্পরায়। তাদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্পের উন্নয়ন হলেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি শ্রমিকদের। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনভর খাটুনির পর একজন স্থায়ী শ্রমিক যা মজুরি পান, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সুপেয় পানিসহ মৌলিক সব সূচকে পিছিয়ে রয়েছেন তারা। জরাজীর্ণ বাসস্থান আর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকায় বিভিন্ন রোগে ভুগছেন অনেকে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, দেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসেনি দরিদ্র চা শ্রমিকদের। চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদ (বিটিএ) ও চা শ্রমিক ইউনিয়নের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। প্রতি দুই বছরের জন্য এ চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দৈনিক ১১৭-১২০ টাকা করা হয়। পরে ২০২২ সালে চা শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৬৮-১৭০ টাকা নির্ধারণ হয়। সেটি কার্যকর হয় ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি। বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর বাগানের শ্রমিক দিনে ১৭০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর বাগানের শ্রমিক ১৬৯ ও তৃতীয় শ্রেণীর বাগানের শ্রমিক ১৬৮ টাকা মজুরি পান।

চা শ্রমিক ইউনিয়ন বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা বলেন, ‘‌সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। প্রায় দেড় বছর পার হতে চলছে এখনো নতুন চুক্তি হয়নি।’

মজুরি কম হলেও আবাসন, চিকিৎসা, রেশনের মতো সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে শ্রমিকদের বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশীয় চা সংসদ সিলেট অঞ্চলের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ শিবলি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কম হলেও চা বাগান মালিকরা তাদের থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসা, রেশন ইত্যাদির মতো সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ করেন, যা অর্থের দিক দিয়ে পরিমাপ করা হয় না। সব সুযোগ-সুবিধা হিসাব করলে তাদের মাসিক মজুরি ১২-১৫ হাজার টাকা হয়, যা অন্য শিল্পের চেয়ে বেশি।’ তিনি জানান, সব কিছুর দাম বেড়েছে, শুধু চা বাদে। অধিকাংশ বাগান মালিক লোকসানে রয়েছেন। অনেক বাগান মালিক শ্রমিকের মজুরি দিতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না।

স্ট্যাটিস্টিক্যাল হ্যান্ডবুক অন বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি বুক ২০১৯-এর তথ্য মতে, দেশের ১৬৬টি (বর্তমানে ১৬৮টি) চা বাগানে স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৭৪৭। অস্থায়ী চা শ্রমিকের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৪৩৭ এবং চা জনগোষ্ঠীর মানুষ ৪ লাখ ৭২ হাজার ১২৫ জন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্যানুযায়ী, এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে অনিয়মিত ও বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। আর চা জনগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা প্রায় আট লাখ। এদের দুই-তৃতীয়াংশ মৌলভীবাজারের ৯০টি চা বাগানে বসবাস করেন।

দেশে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া ও জরায়ু ক্যান্সারের প্রবণতা চা শ্রমিকদের মধ্যে বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। মৌলভীবাজার জেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয় এর অন্তত ৩৬ শতাংশ চা জনগোষ্ঠীর মানুষ। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় গত চার বছরে ১৯ হাজার ৯১৪ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে শুধু চা বাগানের বাসিন্দা ৭ হাজার ২২০ বা ৩৬ শতাংশের বেশি।

কুষ্ঠ রোগের চিত্রটা আরো ভয়াবহ। গত চার বছরে মৌলভীবাজারে ৭৬১ কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৬৩১ জনই চা বাগানের বাসিন্দা। মোট শনাক্তের ৮৩ ভাগই চা জনগোষ্ঠীর মানুষ।

২০১৯ সালে সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রথমবারের মতো জরিপ চালায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের তথ্যানুযায়ী, অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়। ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়। স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তাছাড়া ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ৪৬ শতাংশ কিশোরীর এবং মা হয়ে যাচ্ছেন ২২ শতাংশ। এছাড়া ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই ৬৭ শতাংশ পরিবারের।

এর আগে ২০১৮ সালে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গবেষণা করে জানায়, মৌলভীবাজারে চা বাগানের প্রায় ১৫ শতাংশ নারী জরায়ু ক্যান্সারে ভুগছে।

মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌অনুন্নত জীবন ও পরিমিত খাবারের অভাবে অপুষ্টিতে ভোগেন চা শ্রমিকরা। এ কারণে এদের মধ্যে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ রোগের হার তুলনামূলক বেশি। তাছাড়া কোনো রোগ হলে তারা সহ্য করে চাপিয়ে রাখে। অসহ্য না হলে চিকিৎসকের কাছে আসে না, কারণ ওই দিনের মজুরি পাওয়া যাবে না এই ভয়ে। যার কারণে তাদের রোগ শনাক্ত হয় অনেক দেরিতে অনেক জটিলতাসহ। তবে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চা বাগানে গিয়ে রোগ নির্ণয়ের কাজ করছি, যার কারণে রোগ শনাক্তের হার বেড়েছে।’

বিভাগীয় শ্রম দপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌শ্রম আইনে চা শ্রমিকদের যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। তাদের দাবি-দাওয়া অমূলক নয়। আবার একেবারে যে বাস্তবায়ন হচ্ছে না, তেমন না। অনেক চা বাগান তা বাস্তবায়ন করেছে। আমরা কাজ করছি শ্রমিক মালিক দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে।’

এ সম্পর্কিত আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © সিলেট প্লাস ২০২৪
Theme Customized BY ITPolly.Com